Bank

বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি ২০২৬

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাংকের গুরুত্ব অপরিসীম। টাকা জমা রাখা, ঋণ নেওয়া, বিদেশে টাকা পাঠানো বা ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা সব ক্ষেত্রেই আমরা ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: সরকারি ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংক। এছাড়াও রয়েছে কিছু বিদেশি ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংক। কিন্তু আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে সরকারের সরাসরি মালিকানায় কয়টি ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে? তাদের কার্যক্রম কেমন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি? কারণ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লেনদেন পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ব্যাংকগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখে। চলুন, শুরু করার আগে প্রথমে জেনে নিই বাংলাদেশের ব্যাংকিং কাঠামো সম্পর্কে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং কাঠামো: তফসিলি ও অ-তফসিলি ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ব্যাংকের সংখ্যা ৬১টি। এদের মধ্যে তফসিলি ব্যাংক (Scheduled Bank) ৬১টি এবং অ-তফসিলি ব্যাংক (Non-Scheduled Bank) ৫টি। তফসিলি ব্যাংক বলতে সেসব ব্যাংককে বোঝায় যারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নথিভুক্ত হয়ে দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং আইন মেনে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

তফসিলি ব্যাংকগুলোকে আবার চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:

১. রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক (State-Owned Commercial Banks – SBCs)
২. বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক (Private Commercial Banks – PCBs)
৩. বিশেষায়িত ব্যাংক (Specialized Banks – SBs)
৪. বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক (Foreign Commercial Banks – FCBs)

আমাদের মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে এই তালিকার প্রথম প্রকার, অর্থাৎ রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি (সম্পূর্ণ তালিকা)

সরাসরি প্রশ্নে ফিরে আসি, বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি? উত্তর হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট সরকারি ব্যাংক রয়েছে ৬টি। এই ছয়টি ব্যাংকই তফসিলি ব্যাংক হিসেবে তালিকাভুক্ত এবং এগুলোর মালিকানা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ সরকারের হাতে। অর্থাৎ, এসব ব্যাংকের কোনো বেসরকারি শেয়ার মালিকানা নেই। ব্যাংকগুলো হচ্ছে—

  • অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (Agrani Bank PLC)
  • জনতা ব্যাংক পিএলসি (Janata Bank PLC)
  • সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC)
  • বেসিক ব্যাংক পিএলসি (Basic Bank PLC)
  • রূপালী ব্যাংক পিএলসি (Rupali Bank PLC)
  • বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (Bangladesh Development Bank PLC – BDBL)

উপরের তালিকায় উল্লিখিত ব্যাংকগুলো সরকারের মালিকানায় গঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। এদের মাধ্যমে সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন, আমদানি-রফতানি বিল নিষ্পত্তি এবং অনগ্রসর এলাকায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়। নিচের ছকে এই ব্যাংকগুলোর মোট শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা তুলে ধরা হলো:

ব্যাংকের নামমোট শাখার সংখ্যা (প্রায়)প্রধান কার্যালয় (হেড অফিস)
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি৯৭০টি৯/ডি, দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা
জনতা ব্যাংক পিএলসি৯২১টিজনতা ব্যাংক ভবন, ১১০, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা
সোনালী ব্যাংক পিএলসি১২৩২টি৩৫-৪২, ৪৪ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা
বেসিক ব্যাংক পিএলসি৭২টিসেনা কল্যাণ ভবন, ১৯৫ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা
রূপালী ব্যাংক পিএলসি৫৮৭টিরূপালী ভবন, ৩৪, দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি৫৩টিবিডিবিএল ভবন, ৮, রাজউক এভিনিউ, ঢাকা

আরও জানতে পারেনঃ প্রাইম ব্যাংকে একাউন্ট খোলার নিয়ম

বাংলাদেশের সরকারি ব্যাংকগুলোর বিস্তারিত পরিচিতি

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুধু নাম জানাই যথেষ্ট নয়। এদের ইতিহাস, কার্যক্রম এবং বিশেষত্ব সম্পর্কে জানলে আপনি সঠিক ব্যাংকটি বেছে নিতে পারবেন আপনার প্রয়োজনে। নিচে প্রতিটি ব্যাংক নিয়ে আলোচনা করা হলো।

১. অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (Agrani Bank PLC)

১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ ‘অগ্রণী ব্যাংক’ যাত্রা শুরু করে। স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন হাবিব ব্যাংক লিমিটেড এবং কমার্স ব্যাংক লিমিটেডকে একীভূত করে এই ব্যাংকটি গঠন করা হয়। ২০০৭ সালের ১৭ই মে এটি একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয়, তবে এর শতভাগ মালিকানা এখনও সরকারের হাতেই রয়েছে।

বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ৯৭০-এর বেশি। ঢাকার দিলকুশায় এর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। ব্যাংকটি আমানত সংগ্রহ, ঋণ বিতরণ এবং প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে কৃষি ও এসএমই খাতে ঋণ প্রদানে অগ্রণী ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

২. জনতা ব্যাংক পিএলসি (Janata Bank PLC)

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশবলে ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড এবং ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেড-কে একীভূত করে জনতা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৭ সালের ২১শে মে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়ে ‘জনতা ব্যাংক পিএলসি’ নাম ধারণ করে।

জনতা ব্যাংকের সারাদেশে ৯২১টির বেশি শাখা রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি বৈদেশিক শাখাও রয়েছে। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত এই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে সারাদেশের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে এই ব্যাংকের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

৩. সোনালী ব্যাংক পিএলসি (Sonali Bank PLC)

সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং বৃহত্তম সরকারি ব্যাংক। ১৯৭২ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক অব বাহাওয়ালপুর এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক একত্রিত করে ‘সোনালী ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৭ সালে এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়।

শাখার সংখ্যার দিক থেকে সোনালী ব্যাংক শীর্ষে। দেশের অভ্যন্তরে ১২৩২টি এবং ভারতে কলকাতা ও শিলিগুড়িতে ২টি শাখা মিলিয়ে মোট ১২৩৪টি শাখা রয়েছে। মতিঝিলে এর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে সোনালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. বেসিক ব্যাংক পিএলসি (Basic Bank PLC)

বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক লিমিটেড (BASIC Bank) ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে ঋণ প্রদানের বিশেষ লক্ষ্য নিয়ে এটি গঠিত হলেও বর্তমানে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির বিপুল পরিমাণ ঋণ জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ পেলে এটি আলোচনায় আসে। বর্তমানে ব্যাংকটি পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে এর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের তুলনায় বেসিক ব্যাংকের শাখা সংখ্যা কম, প্রায় ৭২টি।

৫. রূপালী ব্যাংক পিএলসি (Rupali Bank PLC)

১৯৭২ সালে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক-কে একীভূত করে রূপালী ব্যাংক গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালের ১৪ই ডিসেম্বর এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হলেও সরকার এর সিংহভাগ শেয়ারের মালিক।

দেশে ৫৮৬টি শাখা এবং পাকিস্তানের করাচিতে একটি বৈদেশিক শাখা নিয়ে রূপালী ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ঢাকার দিলকুশায় ‘রূপালী ভবনে’ এর প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। বেসরকারি খাতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যাংকটি তার সেবার মান উন্নত করার ওপর জোর দিচ্ছে।

৬. বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (BDBL)

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি ২০০৯ সালের ১৬ই নভেম্বর যাত্রা শুরু করে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়নমূলক আর্থিক প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (BSB) এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (BSRS)-কে একীভূত করে এই ব্যাংকটি গঠন করা হয়।

শিল্পায়ন ও বৃহৎ প্রকল্পে ঋণ প্রদানই এই ব্যাংকের মূল লক্ষ্য। রাজউক এভিনিউয়ে অবস্থিত এই ব্যাংকের শাখা সংখ্যা প্রায় ৫৩টি। দেশের শিল্পখাতের উন্নয়নে এই ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষায়িত ব্যাংক কয়টি ও কি কি?

প্রায়শই সরকারি ব্যাংক আর বিশেষায়িত ব্যাংক নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট খাতে (যেমন—কৃষি, প্রবাসী কল্যাণ) সেবা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক সরকারি মালিকানায় থাকলেও এদেরকে বাণিজ্যিক সরকারি ব্যাংকের তালিকায় ফেলা হয় না। বাংলাদেশে মোট ৪টি বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে:

  1. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (Bangladesh Krishi Bank) – কৃষিখাতে ঋণ প্রদান।
  2. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (Probashi Kallyan Bank) – প্রবাসী কর্মীদের জন্য ঋণ ও সেবা।
  3. রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (Rajshahi Krishi Unnayan Bank) – রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উন্নয়ন।
  4. কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (Community Bank Bangladesh PLC) – ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ও কমিউনিটি উন্নয়ন।

শেষ কথা

আশা করি, উপরের আলোচনা থেকে আপনি জানতে পেরেছেন বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি। এই ছয়টি ব্যাংক দেশের আর্থিক খাতের মূল চালিকাশক্তি। গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাজধানীর বৃহৎ বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই এদের অবদান অনস্বীকার্য। ব্যাংক নির্বাচনের সময় আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে সরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যাপক শাখা নেটওয়ার্ক এবং সরকারি গ্যারান্টি থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে এদের গ্রহণযোগ্যতা আজও অটুট রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button